সাবেকিয়ানায় অশোকনগরের রায়চৌধুরী পরিবারের পুজো আজও অনবদ্য

বিবিপি নিউজ,প্রদীপ ব্যানার্জি: বারোয়ারি পুজোগুলিতে লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া, বেশির ভাগ ক্লাবগুলোর মধ্যে শুরু হয়েছে থিমের প্রতিযোগিতা। তবে এই সমস্ত বারোয়ারি পুজোর বাইরেও আরও এক রকম পুজো হয় অশোক নগরের বেশ কিছু বনেদি বাড়ির ঠাকুরদালানে।

এই সব বাড়ির পুজো কোনোটা একশ বছরের পুরোনো, কোনটা আবার দু-তিনশ, এমনকি চারশ বছরেরও বেশি পুরানো। আর এই সমস্ত বনেদি বাড়ির পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কত শত ইতিহাস আর পরম্পরা। এখন হয়তো অনেক বাড়িতেই আগের মত সেই চোখ-ধাঁধানো জৌলুস নেই, ঠিকই। কিন্তু এই সব বাড়ির পুজো হয় অতীতের পরম্পরা মেনে, নিষ্ঠা সহকারে। বাড়ির বেশির ভাগ সদস্যরা অন্যত্র থাকলেও দূর্গা পূজার সময় সবাই এক সঙ্গে মিলিত হবার চেষ্ঠা করেন। অশোক নগরের ১৪নম্বর ওয়ার্ডের জনকল্যাণ ক্লাব সংলগ্ন অঞ্চলের রায়চৌধুরী পরিবারের দূর্গা পূজা সাবেকিয়ানায় আজও বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য।

এই রায়চৌধুরী বাড়ির দূর্গা পূজা প্রায় সাড়ে চারশ বছরেরও বেশি পুরোনো। পরিবার সূত্রে জানা গেলো তৎকালীন পূর্ব বঙ্গের ফরিদপুর জেলার মাদারী মহকুমার ধোঁয়াশা গ্রামের জমিদার ঈশ্বর সীমান্ত রায়
চৌধুরীর হাত ধরেই ১৫৬৪ সালে এই রায়চৌধুরী পরিবারের পুজোর সূত্রপাত ।

বাড়ির আটচালা নাট মন্দিরে রাখী পূর্ণিমার দিন কাঠামো পুজোর মধ্যে দিয়ে শুরু হতো প্রতিমা নির্মাণের কাজ। তারপর মহা ষষ্ঠীর পূণ্য লগ্নে দেবীর বোধন সম্পন্ন করে মহা আড়ম্বরের সাথে উদযাপিত হতো এই পরিবারের পূজা।

সেই সময় এই জমিদার বাড়ির পুজোর জৌলুস ছিলো চোখে পড়ার মতো। লোক সমাগমে সব সময় মুখরিত হয়ে থাকত, জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোক জন আসত এই জমিদার বাড়িতে।
একসময় পুজোর চারদিন মহিষ বলি হতো, পরবর্তী সময় ১৭৫০ সালে ঈশ্বর চন্দ্র রায় চৌধুরীর আমল থেকে মহিষ বলি বন্ধ হয়ে পাঠা বলি হতো।

দেশ ভাগের পরেও ১৯৬২ সাল পর্যন্ত এই পরিবারের পুজো অধুনা বাংলাদেশেই হতো।
তারপর এক রকম বাধ্য হয়েই ঈশ্বর যামিনী কান্ত রায়চৌধুরী ভিটে মাটি ছেড়ে স্বপরিবারে চলে আসেন এই দেশে।
তার পর কঠিন লড়াই সংগ্রামের পর অশোকনগরের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের জনকল্যাণ ক্লাব অঞ্চলে নিজস্ব বাড়িতে ১৯৬৩ সালে মন্দির স্থাপন করে এখানেই চলতে থাকে মায়ের পুজো।

বর্তমানে পুজোর দায়িত্ব সামলান রায়চৌধুরী পরিবারের অষ্টম বংশধরেরা শ্রী সমিরন রায়চৌধুরী, শ্রী অভিজিৎ রায় চৌধুরী, শ্রী শান্তনু রায়চৌধুরী, শ্রী অতনু রায়চৌধুরী, শ্রী রাজকুমার রায়চৌধুরী এছাড়া বাড়ির সকল আত্মীয় স্বজনদের সহযোগিতায় বেশ ধুম ধাম করেই উদযাপিত হয় এই বাড়ির পুজো।

বাড়ির প্রবীণ সদস্য ৯১ বছর বয়সের বৃদ্ধ শ্রীযুক্ত সুশীল রায়চৌধুরী মহাশয় জানালেন এতকিছুর মধ্যেও এই পরিবারের দূর্গা পূজায় কোনো দিন ছেদ পড়েনি।

এই বাড়ির দূর্গা প্রতিমার বিশেষ বৈশিষ্ঠ হচ্ছে মা দুর্গার বাম পাশে গণেশের সাথে সরস্বতী থাকেন আর দক্ষিণ পাশে লক্ষ্মীর সাথে কার্তিকের অবস্থান লক্ষ্য করা যায়।

পরিবার সূত্রে জানা গেলো
এক চালার সাবেকি দূর্গা প্রতিমায় মায়ের পুজো হয় সমস্ত রকম নিয়ম নিষ্ঠা মেনে।প্রতিদিন মায়ের ভোগ নিবেদন করা হয়। এর সাথে প্রতিদিন মা চামুন্ডার উদ্দেশ্যে আলাদা করে একটা মাছের ভোগ নিবেদন করা হয়। আগে পাঠা বলি হলেও বর্তমানে নবীন প্রজন্মের সদস্যদের আপত্তিতে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে পুজোতে জিব হত্যার এই প্রথা, তার বদলে চাল কুমড়ো, শসা আখ বলি দেওয়া হয।

এই পরিবারের পুজোর বিশেষ আকর্ষণ হচ্ছে মহা নবমীর দিন শত্রু বলিদান অনুষ্ঠান।
কথিত আছে অসরিও শক্তির কু-প্রভাব থেকে বংশ রক্ষার জন্য এই শত্রু বলি দেওয়া হতো। তবে এ কোন প্রাণী হত্যা নয়। একটা বড়ো কচু পাতার উপর চালের গুঁড়ো দিয়ে একটি পুতুল তৈরি করা হয়, তার পর সেই পুতুলটির গায়ে লাল, হলুদ, কালো, সবুজ রং দিয়ে এরপর পাতায় মুড়ে কলা গাছের বাকল ছিড়ে দড়ি বানিয়ে এই প্রতীকী শত্রুকে বেঁধে বা হাতে খড়্গ দিয়ে সাত টুকরো করে সেগুলোকে শূন্যে ছুড়ে ফেলা হয়। আবহমান কাল ধরে চলে আসছে রায় চৌধুরী পরিবারের এই শত্রু বলিদান প্রথা।

আগে বাড়ির ঠাকুর দালানেই প্রতিমা নির্মাণ হতো কিন্তু ইদানিং মৃৎ শিল্পীর ঘর থেকেই চতুর্থীর দিনে প্রতিমা নিয়ে আসা হয়।

সময়ের সাথে সাথে বহু কিছু পাল্টালেও আজও পরিবারের পুজোতে আচার নিষ্ঠায় কোনো খামতি নেই।

গত দুই বছর করোনার কারণে পুজোতে সেই রকম জৌলুস ছিলনা, তাই এই বছর পরিস্থিতি সাভাবিক হওয়াতে বাড়ির সকল সদস্যরা এখন থেকেই পুজোর আনন্দে মেতে উঠেছেন।